পুলিৎজার জয়ী পনির হোসেন: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিকতার গর্ব
মাসুদ আল হাসান:
বিশ্বব্যাপী ফটোসাংবাদিকতার বিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের
যে নামটি সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে প্রতিধ্বনিত হয়, তিনি হলেন পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী
আলোকচিত্রী মোহাম্মদ পনির হোসেন। ১৯৮৯ সালের ১০
মে মুন্সীগঞ্জের গুয়াখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করা পনিরের বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানোর এই যাত্রা
ছিল প্রচণ্ড অধ্যাবসায়, গভীর সহানুভূতি এবং গল্প বলার এক সহজাত প্রবৃত্তি
দ্বারা সংজ্ঞায়িত। সাধারণ পরিবারে
পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় হিসেবে বেড়ে ওঠা পনিরের মানুষের জীবন ও বাস্তবতা সম্পর্কে
শৈশব থেকেই ছিল গভীর কৌতূহল; যা পরবর্তীতে তাঁর লেন্সের বর্ণনাভঙ্গিকে এক
অনন্য রূপ দিয়েছে।
পনিরের শিক্ষাজীবনের শুরুটা আলোকচিত্র নির্ভর ছিল না। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে মার্কেটিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করলেও ভিজ্যুয়াল
স্টোরিটেলিং বা ছবির মাধ্যমে গল্প বলার নেশা তাঁকে দ্রুতই ক্যারিয়ার পরিবর্তনে বাধ্য
করে। ২০১৪ সালে 'কাউন্টার ফটো'-তে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি মেন্টরশিপ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে
দেয়। এরপর তিনি কনরাড অ্যাডেনাউয়ার ফাউন্ডেশনের স্কলারশিপ
নিয়ে ফিলিপাইনের আতেনেও ডি ম্যানিলা ইউনিভার্সিটি থেকে ভিজ্যুয়াল জার্নালিজমে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট
ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন।
২০১৬ সালে রয়টার্সে যোগদানের আগে তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায়
কাজ করে নিজেকে বিশ্বমানের সংবাদিক হিসেবে গড়ে তোলেন। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ
অর্জনটি আসে ২০১৭ সালে। মিয়ানমার থেকে
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সংকট নিয়ে কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রয়টার্সের
সেই ফটোগ্রাফি টিমে অন্তর্ভুক্ত হন, যারা 'ফিচার ফটোগ্রাফি' বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কার জয়
করে। নির্বাচিত ছবিগুলোর মধ্যে তিনটি ছিল পনিরের তোলা। বিশেষ করে, নৌকাডুবির পর মৃত শিশুকে ধরে থাকা এক শোকাতুর মায়ের
ছবিটি একই সাথে ট্র্যাজেডি এবং সাক্ষী হওয়ার নৈতিক দায়িত্বকে বিশ্ববিবেকের সামনে
মূর্ত করে তোলে।
পুলিৎজার ছাড়াও তিনি কালিঙ্গা-এফসিসি অ্যাওয়ার্ড এবং
ওভারসিজ প্রেস ক্লাব থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁর কাজ দ্য
নিউ ইয়র্ক টাইমস ও দ্য গার্ডিয়ানের মতো শীর্ষ মাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। বর্তমানে ঢাকায় রয়টার্সের হয়ে কাজ করা পনির হোসেন কেবল ছবি তোলেন না; বরং জলবায়ু
ঝুঁকি ও সামাজিক অবিচারের মতো সত্যগুলোকে সামনে এনে বিশ্বকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে
বাধ্য করেন। তাঁর এই কৃতি বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিকতার ইতিহাসে এক
গৌরবময় অধ্যায়।